অপরাধবোধ থেকে বের হয়ে আসার উপায়

0
350
অপরাধবোধ থেকে বের হয়ে আসার উপায়
5 (100%) 10 votes

মানুষ অপরাধ করে, কেউ হয়তো জেনে শুনে করে কেউ বা না জেনে ভুল বশত করে থাকে। জেনে শুনে যারা অপরাধ করে থাকে তাদের মধ্যে কোন অপরাধ বোধ সৃষ্টি হয় না, আর কারো দ্বারা জেনে কিংবা ভুল বশত কোন অপরাধ সংঘটিত হয়ে গেলে তাদের মধ্যে অপরাধ বোধ কাজ করতে থাকে যা মানুষের মধ্যে এক ধরনের যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। তাই মানুষ এই অপরাধ বোধ হতে বের হয়ে আসতে চায়। আমার এই আর্টিকেল এ দুইটি পর্বের মাধ্যমে নিম্নে আলোচনা করা হলো কিভাবে মানুষ অপরাধবোধ থেকে বের হয়ে আসতে পারে।

প্রথম পর্ব> অপরাধ সম্পর্কে বুঝতে পারা

অপরাধবোধ একটি বিষণ্ণ অনুভূতি যা একজন ব্যাক্তিকে জীবনের সামনের দিকে অগ্রসর হতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইহা সম্ভবত বুঝতে পারা খুব কঠিন যে কিভাবে নেতিবাচক অনুভূতি কে বন্ধ করা যায় এবং অতীত কর্মের সঙ্গে মোকাবেলা করা যায়। যাই হোক এই নিবন্ধটি একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হতে সাহায্য করবে কিভাবে নেতিবাচক দিক কে দূরে ঠেলে ইতি বাচক ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হওয়া যায়। প্রক্রিয়াগুলো নিম্নরূপঃ

১) অপরাধের উদ্দেশ্য বুঝতে হবেঃ

বেশিরভাগ সময়ে আমরা অপরাধবোধে ভুগী কারণ আমরা এমন কিছু করি বা বলি যা অন্যের কষ্টের কারন হয়ে দাঁড়ায়। স্বাভাবিকভাবেই কোন কিছুর জন্য আমরা দোষী অনুভব করি। উদাহরন স্বরূপ বলা যায় যে, যদি আমরা বন্ধুর জন্মদিন ভুলে যাই তা আমাদের মধ্যে অপরাধ বোধের সৃষ্টি করে কেননা বন্ধুরা আশা করে যে আমরা তাদের জন্মদিন মনে রাখবো এবং খুব উৎসব করে তাদের জন্মদিন পালন করবো। এই ভুলে যাওয়া টা একটি ছোট অপরাধ কিন্তু এটি একজনের সাথে আরেক জনের সম্পর্ক কে ক্ষতিগ্রস্থ করে।

২) অপরাধ সনাক্ত করা বা চিনতে পারাঃ

কোন কোন সময়ে আমরা এমন অপরাধ বোধে ভুগী যখন হয়তো আমাদেরকে অপরাধী ভাবার কোন কারন নেই। এই ধরনের অপরাধ কোন উদ্দেশ্য মূলক অপরাধ নয় কিন্তু তা আমাদের খারাপ লাগায়। উদাহরনস্বরূপ বলা যায়, আমরা যদি বন্ধুর জন্মদিনে কাজ না করতে পারি এবং তার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না পারি। যদি আমাদের সারাদিনের কর্মসূচী থেকে জন্মদিনের অনুষ্ঠানের জন্য সময় বের করতে না পারি এবং তা আমাদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে হয় তবে বন্ধু মনে করবে যে চাকুরী বাঁচানোর জন্য তার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হই নি।

৩) অপরাধের বিষয় চিহ্নিত করাঃ

যদি কোন কারনে কোন বিষয়ে আমরা অপরাধ বোধে ভুগী তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কি বিষয়ে আমরা অপরাধ বোধ করছি এবং কেন করছি তা খুজে বের করতে হবে। অপরাধের কারন এবং কেন অপরাধ বোধ তৈরী হলো তা যদি বের করা যায় তবে তা অপরাধবোধ থেকে বের হতে সহায়তা করবে। আর অপরাধ বোধ হতে বের হয়ে আসার জন্য এই অনুভুতি গুলোর মাধ্যমে কাজ করতে হবে।

৪) অনুভূতি সম্পর্কে লেখাঃ

write about guilt
আমাদের অপরাধ সম্পর্কে আমরা যদি লিখি তবে তা আমাদের বুঝতে এবং মোকাবেলা শুরু করতে সাহায্য করতে পারে। যদি কারো সাথে এমন কিছু করে বা বলে থাকি যার কারনে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে তাবে এর বিশদ নিচে লিখতে শুরু করতে পারি। যেমন- কেন আমি নিজেকে দোষী মনে করছি এমনকি কি ভাবে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো এবং কেন হয়েছিলো। আমরা কি নিজেদেরকে এই কারনে অপরাধী মনে করি?
উদাহরনস্বরূপ বলা যায় আমরা কেন আমাদের বন্ধুর জন্মদিন ভুলে গেছি সেই কারন গুলো লিখতে পারি। কি ধরনের বিভ্রান্তিতে ছিলাম সেই সময়ে? আমার বন্ধু কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলো? এই কারনে আমি নিজে কেমন বোধ করেছিলাম?

(৫) প্রয়োজন মনে হলে ক্ষমা চাইতে হবে

sorry

একবার যদি আমরা নির্ধারণ করে ফেলি যে আমরা অপরাধী তা যাই হোক না কেন আমাদের মন কে স্থির করতে হবে এবং প্রয়োজনে ক্ষমা চাইতে হবে। আমাদের বন্ধুর জন্মদিন এর ক্ষেত্রে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত কারণ আমরা কিছু করতে ভুল করেছি যা বন্ধুরা অনুমান করেছিল যে আমরা তার জন্য করবো।
উদাহরনস্বরূপ নিশ্চিত করতে হবে যে আমরা যে কৈফিয়ৎ দিবো তা অবশ্যই আন্তরিক হবে এবং তা কৃত কর্মের জন্য অজুহাত স্বরূপ হবে না। ইহা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে আমাদের বন্ধুর কাছে দেখাতে হবে যে, জন্মদিন মনে না রাখতে পারার জন্য আমি খুবই দুঃখিত এবং আমার খুবই খারাপ লেগেছে। সহজ ভাবে আমরা তাকে বলতেও পারি “আমি সত্যিই খুব দুঃখীত……মনে রাখতে না পারার জন্য।”

৬) একই রকম পরিস্থিতি প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনা করাঃ

আমরা আমাদের ভুল কে মেনে নিয়ে, এই ভুলের উৎসকে বের করে এবং প্রয়োজন আনুযায়ী ক্ষমা প্রার্থনা করে কিছু সময় গভীর ভাবে চিন্তা করতে হবে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের উন্নত হতে সাহায্য করবে, ভবিষ্যতে এই ধরনের অবস্থা কিভাবে প্রতিরোধ করা যায় তা জানতে সহায়তা করবে, তা না হলে এই ধরনের ভুল আবার হবে।
উদাহরনস্বরূপ বলা যায় বন্ধুর জন্মদিন ভুলে যাবার অভিজ্ঞতার পর সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে ভবিষ্যতে অনুরূপ পরিস্থিতি প্রতিরোধের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যেমন আরো যত্ন সহকারে গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলি স্মরণ রাখতে হবে এবং নোট বা ইভেন্ট করে রাখা যেতে পারে।

দ্বিতীয় পর্বঃ অতীতের অপরাধ কে দূরে সরিয়ে ফেলা

১) অপরাধ কে কৃতজ্ঞতায় পরিবর্তন করনঃ

অপরাধ বোধ আসে আমরা নিজেকে অপরাধী চিন্তা করি বলে। যেহেতু আপনার বন্ধু আপনাকে ক্ষমা করেছে এই কারনে আপনার অপরাধ বোধ কে কৃতজ্ঞতায় পরিবর্তন করতে হবে।
উদাহরনস্বরূপ যদি আমরা আমাদের বন্ধুর জন্মদিন ভুলে যাই আর নিজেরাই ভাবী যে “গতকাল বন্ধুর জন্মদিন ছিলো যা আমার মনে রাখা উচিত ছিলো”। এই চিন্তা আমাকে অবস্থার উন্নতি করতে অনুমতি দেয় না, বরং এই ভাবনা মনের দিক থেকে আরো ছোট করে দেয় যে বন্ধুর জন্মদিন ভুলে গেছি আমি। অপরাধ বোধের ধারনাকে ইতিবাচকে পরিবর্তন করতে হবে যেমনঃ “আমি কৃতজ্ঞ এই জন্য যে আমার বন্ধুরা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তারা আমাকে ক্ষমা করেছে এবং তাদের কাছে ভবিষ্যতে ব্যবহারিক প্রমাণ দেয়ার একটা সুযোগ পাওয়া গেছে”।

২) নিজেকে ক্ষমা করতে হবেঃ

forgive yourself
যেভাবে আমরা নিজের একজন বন্ধুকে ক্ষমা করি ঠিক সেভাবে নিজেকেও ক্ষমা করতে হবে এটা খুবই গুরুত্ব পূর্ণ অংশ আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে কি ভাবে আমরা অপরাধবোধের সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারবো। আমাদের অপরাধের জন্য আমরা অন্যের কাছে ক্ষমা চাইতে পারি, তবে সে ক্ষমা করবে কিনা তা আমদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে। তবে নিজেকে ক্ষমা করা আমাদের নিজের হাতে। তাই আমাদেরকে শিখতে হবে কি ভাবে নিজেকে ক্ষমা করা যায়। এক কথায় বলা যায় যে অতীতের ভুল গুলোকে দূরে সরিয়ে ফেলে নিজেকে ক্ষমা করতে হবে যেভাবে আমাদের প্রিয় বন্ধুকে আমরা ক্ষমা করি। পরবর্তী সময়ে আমরা যদি কোন কিছুর জন্য অপরাধ বোধে ভুগী, একটি গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে দোষী ভাবা বন্ধ করতে হবে, তার পরির্বতে এটি বলতে হবে “আমি একটি ভুল করেছি, কিন্তু তা আমাকে খারাপ ব্যাক্তিতে পরিণত করে না।”

৩) স্কারলেট ও’হারা একটি কল্পিত চরিত্র যা থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারেঃ

উদ্ধৃতি টি বিবেচনা করা যেতে পারে। “সর্বপরি…… আগামী কাল অন্য একটি দিন।” অনুভব করুন প্রত্যেকদিনই নতুন করে, একটি দিন শুরু হয় প্রতিজ্ঞা, আশা এবং সৌভাগ্যের সাথে। আমরা যখন বুঝতে পারবো আমাদের কার্যক্রম ভুল হচ্ছে, কার্যক্রমগুলো কোন ভবিষ্যত নির্দেশ করছে না। এমন কি তার ফলস্রুতিতে তারা বাকী জীবনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রন করছে না তখন কার্য্যক্রম এ পরিবর্তন আনবো।

(৪) একটি ভাল কাজ করতে হবেঃ

প্রায়ই যারা সাহায্য চায় আমরা তাদের কাছে যাই সাহায্য করার জন্য। যদিও আমরা বুঝতে পারি যে, আমরা যা করছি তা অবশ্যই ভালো কাজ এবং এটি আমাদের সামনের দিকে এগোতে সাহায্য করবে। এমন কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, অন্যদেরকে সাহায্য করা একটি বড় ব্যাপার আমাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য লাভজনক হয়।
স্থানীয় হাসপাতাল, দাতব্য ও স্বেচ্ছাসেবক অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক ব্যাক্তি সম্পর্কে খোঁজ নেয়া যেতে পারে। এমনকি প্রতি সপ্তাহে কয়েক ঘন্টার জন্য স্বেচ্ছাসেবকগণ আলোচনা মানসিক অপরাধবোধ হতে বের করে আসতে সাহায্য করে।

৫) আধ্যাত্মিক অনুশীলন করতে পারেনঃ

meditation
কিছু ধর্মে পাপ প্রাশ্চিত্ত করার উপায় রয়েছে যা অপরাধবোধের সঙ্গে মোকাবেলা করার জন্য আমাদের কে সহায়তা করতে পারে। পছন্দনীয় অথবা উন্নত একটি ধর্মীয় বাড়িতে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে। আধ্যাত্মিকতা অপরাধবোধের মুক্তিদান করে থাকে। গবেষণা দেখা যায় যে আধ্যাত্মিকতা এবং প্রার্থনা চাপ উপশম এমনকি অসুস্থতার সময়ে নিরাময় গুণ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করতে পারে। ধর্মাচরণের একটি জায়গা হচ্ছে প্রকৃতির ধ্যান বা যোগ ব্যায়াম। তবে এর জন্য সময় ব্যয় করতে হবে প্রকৃতির সাথে এবং প্রাকৃতিক বিশ্বের সৌন্দর্য্যের প্রশংসা করতে হবে।

৬) একজন থেরাপিষ্ট এর সাহায্য নেয়া যেতে পারেঃ

আমাদের নিজেদের অতীত অপরাধ বোধ হতে সরে আসতে চাইলে একজন থেরাপিষ্ট এর মতবাদ গ্রহন করা যেতে পারে। কিছু মানুষ অপরাধ এ হস্তক্ষেপ করে তাদের দৈনন্দিন জীবন এবং সুখের জন্য। সাহায্য ছাড়া নিজের দোষ বুঝতে পারা এবং সেই সব অনুভুতির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই কঠিন ব্যাপার। একজন লাইসেন্সকৃত পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সাহায্য করতে পারেন এই অনুভূতিগুলো বোঝার জন্য এবং এর মাধ্যমে কাজ করার জন্য। মনে রাখতে হবে যে অত্যাধিক অপরাধ বোধ নিম্নস্থ মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা প্রমান করে এবং তার চিকিৎসা করা প্রয়োজন।

আশা করি পরামর্শ গুলো অপরাধ বোধ থেকে বের হয়ে আসতে আপনাদের সহায়তা করবে।

Afsana Tabassum

Afsana Tabassum

Afsana completed BSS LLB under national university. She is always helpful to everyone. She loves music very much and loves to read books specially poem. She also writes poem and story. On the other hand she is very conscious about fashion and beauty.
Afsana Tabassum

Comments

লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো ?

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY