কিভাবে ভালো প্রতিবেশী হতে পারবেন

0
268
কিভাবে ভালো প্রতিবেশী হতে পারবেন
5 (100%) 1 vote

মানুষ সামাজিক জীব। তাই একজন মানুষ যেখানেই থাকুক না কেন সেখানেই থাকে তার সমাজ, থাকে প্রতিবেশী। সেই সমাজ ও প্রতিবেশীদের সঙ্গ নিয়ে এবং সঙ্গ দিয়েই তাকে জীবন যাপন করতে হয়। পরদেশী, পরজাতি কিংবা পরমতাবলম্বী সবার বেলায়ই বিষয়টি শাশ্বত সত্য।

আমাদের আশেপাশের ৪০ বাড়ি পর্যন্ত সবাই প্রতিবেশী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহপাঠী, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী, যাত্রাপথে সহযাত্রীও প্রতিবেশীর অন্তর্ভুক্ত। প্রতিবেশীরাই বিপদ-আপদে সবচেয়ে আগে এগিয়ে আসে। প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায় এবং মানসিকভাবে ভালো থাকা যায়। প্রতিবেশী বলতে মুসলিম, কাফের, নেক বান্দা, ফাসেক, বন্ধু, শত্রু, পরদেশী, স্বদেশী, উপকারী, ক্ষতিসাধনকারী, আত্মীয়, অনাত্মীয়, নিকটতম বা তুলনামূলক একটু দূরের প্রতিবেশী সবাই অন্তর্ভুক্ত।

প্রতিবেশীর পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা, উদারতা ও সমবেদনার সম্মেলন ঘটে তখন এ ঘনিষ্ঠতা ও আত্মার বন্ধন আরো বেশি শক্তিশালী ও মজবুত হয়। ফলে সেখানে সৃষ্টি হয় একটি নিরাপদ, নির্মল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ। পান্তরে যখন প্রতিবেশী অপর প্রতিবেশীর প্রতি সহযোগিতার হাত না বাড়ায়, পরস্পর উদারতা, সহমর্মিতা ও সমবেদনার মনোভাব পোষণ না করে তখনই তাদের পরস্পরের জীবন হয়ে উঠে বিষাদময়। একে অপরের কষ্টের কারণ হয় এবং অতি সহজেই সে পরিবেশ হয়ে উঠে অসহনীয় ও দুর্বিষহ। এক কথায় সমাজবদ্ধ জীবনের সুখ শান্তি বহুলাংশেই নির্ভর করে সুন্দর প্রতিবেশীর উপর। তাই ইসলাম মানুষের সমাজবদ্ধ জীবনকে সুন্দর ও সুখময় করে তোলার জন্য বিষয়টির প্রতি খুবই গুরুত্বারোপ করেছে।

প্রতিবেশী সাধারণত তিন শ্রেণীর হয়ে থাকে এবং তাদের হকও বিভিন্ন দিকে লক্ষ্য করে কম বেশী হয়ে থাকে।
১. যার এক দিক থেকে হক থাকে। সে হল, অনাত্মীয় বিধর্মী প্রতিবেশী। এ ব্যক্তির হক শুধু প্রতিবেশী হওয়ার ভিত্তিতে।
২. যার দুই দিক থেকে হক থাকে। সে হল, মুসলিম প্রতিবেশী, যার সাথে আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই। এ ব্যক্তির হক প্রতিবেশী এবং মুসলিম হওয়ার দিক থেকে।
৩. যার তিন দিক থেকে হক থাকে। সে হল, মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী। এ ব্যক্তির হক প্রতিবেশী, মুসলিম ও আত্মীয় হওয়ার দিক থেকে।

তবে প্রত্যেক শ্রেণীই যেহেতু প্রতিবেশী তাই প্রতিবেশীর সকল হকের ক্ষেত্রে সবাই সমান হকদার। আর প্রতিবেশীর খোঁজ খবর রাখা, বিপদে আপদে এগিয়ে যাওয়া, একে অপরের সুখ-দুঃখের শরিক হওয়া, হাদিয়া আদান প্রদান করা, সেবা করা, প্রতিবেশীর কেউ মারা গেলে সান্ত্বনা দেওয়া, কাফন দাফনে শরিক হওয়া, একে অপরের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রতিবেশীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রতিবেশীর কষ্টের কারণ হয় এমন সব ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি সবই একজন মুমিনের স্বভাবজাত বিষয় হওয়া উচিত।

প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ
প্রতিবেশী আমার জীবনের আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। তার সাথে আমার আচরণ সুন্দর হবে তা কি বলে বোঝাতে হয়? আর আমি যদি মুমিন হই তাহলে তো তা আমার ঈমানের দাবি। হযরত আবু শুরাইহ্ রা. বলেন, আমার দুই কান শ্রবণ করেছে এবং আমার দুই চক্ষু প্রত্যক্ষ করেছে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং আখেরাতে বিশ্বাস রাখে সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীকে সম্মান করে। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় আছে ‘সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করে।’

neighbour-2

প্রতিবেশী যদি দরিদ্র হয়
আর প্রতিবেশী যদি দরিদ্র হয় তাহলে এ বিষয়ে তার হক আরো বেশি। কারণ দরিদ্রকে খানা খাওয়ানো যেমন অনেক সওয়াবের কাজ তেমনি দরিদ্রকে খানা না-খাওয়ানো জাহান্নামে যাওয়ার একটি বড় কারণ। কুরআন মজীদে ‘ছাকার’ নামক জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে নামায না পড়ার বিষয়টির সাথে সাথে দরিদ্রকে খানা না খাওয়ানোও গুরুত্বসহকারে উল্লেখিত হয়েছে। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, (জাহান্নামীকে জিজ্ঞেস করা হবে) (অর্থ) কোন বিষয়টি তোমাদেরকে ‘ছাকার’ নামক জাহান্নামে ঠেলে দিয়েছে? (তারা উত্তরে বলবে) আমরা নামায পড়তাম না এবং দরিদ্রকে খানা খাওয়াতাম না।

প্রতিবেশীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার
অনেক সময় এমন হয়, প্রতিবেশীর প্রয়োজনে কিছু ছাড় দিতে হয়। কিংবা নিজের কিছু ক্ষতি স্বীকার করলে প্রতিবেশীর অনেক বড় উপকার হয় বা সে অনেক বড় সমস্যা থেকে বেঁচে যায়। তেমনি একটি বিষয় হাদীস শরীফে উদ্ধৃত হয়েছে, যা মুমিনকে এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো প্রতিবেশী যেন অপর প্রতিবেশীকে তার দেয়ালে কাঠ স্থাপন করতে বাধা না দেয়।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আদান প্রদান
আমাদের প্রায় সকলেরই সূরা মাউন মুখস্থ আছে। ‘মাউন’ অর্থ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। দৈনন্দিন জীবনে আমাদের ছোট খাট অনেক জিনিসেরই প্রয়োজন হয়। কোনো বস্ত্ত হয়তো সামান্য, কিন্তু তার প্রয়োজন নিত্য। যেমন লবন। খুবই সামান্য জিনিস, কিন্তু তা ছাড়া আমাদের চলে না। কখনও এমনও হয় দশ টাকার লবন কেনার জন্য বিশ টাকা রিক্সা ভাড়া খরচ করতে হবে বা এখন এমন সময় যে তা পাওয়া যাবে না। অথচ লবন না হলে চলবেই না। তখন আমরা পাশের বাড়ি বা প্রতিবেশীর দ্বারস্থ হই। এমন সময় এ সাধারণ বস্ত্তটি যদি কেউ না দেয় তাহলে নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট হয়ে যাবে। কোনো প্রতিবেশী যদি এমন হয় তাহলে তাকে ধিক শত ধিক। আল্লাহও তাকে ভৎর্সনা দিয়েছেন। সূরা মাউনে আল্লাহ বলেছেন, (অর্থ) সুতরাং দুর্ভোগ সেই সালাত আদায়কারীদের, যারা তাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন, যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে, এবং গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট-খাট সাহায্যদানে বিরত থাকে।

প্রতিবেশীর দোষ ঢেকে রাখব
পাশাপাশি থাকার কারণে একে আপরের ভালো মন্দ কিছু জানাজানি হয়ই। গোপন করতে চাইলেও অনেক কিছু গোপন করা যায় না। প্রতিবেশীর এসকল বিষয় পরস্পরের জন্য আমানত। নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণেই একে অপরের দোষ ঢেকে রাখা জরুরি। আমি যদি তার দোষ প্রকাশ করে দিই তাহলে সেও আমার দোষ প্রকাশ করে দিবে। আর আমি যদি তার দোষ ঢেকে রাখি তাহলে সেও আমার দোষ গোপন রাখবে। এমনকি এর বদৌলতে আল্লাহও আমার এমন দোষ গোপন রাখবেন, যা প্রতিবেশীও জানে না। হাদীস শরীফে এসেছে, যে তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ ঢেকে রাখে আল্লাহও কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন।

রাসূল সা: ইরশাদ করেন, প্রতিবেশীর কী কী হক রয়েছে সে সম্পর্কে তোমরা অবগত আছো কি? তখন তিনি পাড়া-প্রতিবেশীর প্রতি দশটি হকের কথা বর্ণনা করেন। হকগুলো হলো
১. প্রতিবেশী তোমার সাহায্য চাইলে তাকে তুমি সাহায্য করবে;
২. সে তোমার অভয় চাইলে তুমি তাকে অভয় দেবে;
৩. সে করজে হাসানা চাইলে তুমি তাকে করজ দান করবে;
৪. সে নিঃস্ব হলে তাকে দান করবে;
৫. সে পীড়িত হলে তার সেবা শুশ্রূষা করবে;
৬. তার মৃত্যু হলে তার জানাজার নামাজে শরিক হবে;
৭. তার সুসংবাদ লাভে তুমি খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করবে;
৮. তোমার গৃহ তার গৃহের চেয়ে এত বেশি উঁচু করবে না, যাতে বায়ু চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়ে তার অসুবিধার কারণ হয়;
৯. তার বিপদাপদে সহানুভূতি প্রকাশ করবে এবং
১০. তুমি কোনো ফলফলাদি খরিদ করলে এবং ভালো খাবারের আয়োজন করলে প্রতিবেশীকেও কিছু অংশ দান করবে।

আমরা সামাজিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে সজাগ হই এবং তা মনেপ্রাণে ও বাস্তবে সংরক্ষণ করি তাহলে প্রতিটি পাড়া, প্রতিটি মহল্লা যা নরকে পরিণত হয়েছে তা একেকটি স্বর্গে রূপান্তরিত হতে পারে।

Shaila Shahanaj

Shaila Shahanaj

Shaila Shahanaj lives with deep passion of in psychology. She have expertise in behavior and mind, embracing all aspects of conscious and unconscious experience as well as thought.
Beside she loves music and read lots of books.
Shaila Shahanaj

Comments

লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো ?

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY