কিভাবে শিশুর নেতৃত্বে দক্ষতা বাড়াবেন

0
524
কিভাবে শিশুর নেতৃত্বে দক্ষতা বাড়াবেন
Rate this post

বিয়ের পূর্বে, সকল মানুষই কিছু স্বপ্নের জাল বুনেন তার অনাগত সন্তানদের নিয়ে; ভাবনার ভীড়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকে কিভাবে সন্তানদের বড় করবেন সেই চিন্তাটি, প্রতিজ্ঞা করেন প্রতিটি সন্তানকে একজন অনুকরণীয় ও চমৎকার ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার।
অনেক মা-ই বাইরে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নেন যেন তাঁরা যথাযথভাবে সন্তানকে লালন পালন করতে পারেন, পাশে থাকতে পারেন সন্তানের বেড়ে উঠার সময়টুকুতে। তারপর যখন তাদের স্বপ্ন সত্যি হয়, তাদের কোল আলো করে আসে চমৎকার একটি সন্তান তখন বাস্তবতা কিছুটা ভিন্নভাবে হাজির হয়। সন্তানদের প্রতিদিনকার লালন পালনে চ্যালেঞ্জগুলো আসে কিছুটা ভিন্নভাবে। সন্তানের খাওয়া-পরা ও তাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার পেছনেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন মা। আর কর্মক্লান্ত বাবা বাসায় ফিরে অল্পেই বিরক্ত হয়ে পড়েন বাচ্চার কান্নায়। আর এই প্রাত্যাহিকতায় আড়াল পড়ে যায় সন্তানের আত্মা ও ব্যক্তিত্বের গঠনের দিকটা; সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের গঠনটাই যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা সেটা বেমালুম ভুলে যান মা-বাবারা।

চলার পথে প্রতিনিয়ত নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তবে কিছু নিয়ম মেনে চললে আপনার সন্তান পাবে সুস্থ সুন্দর পরিবেশ যা তার মানসিক বিকাশ,ও নেতৃত্বে দক্ষতায় সহায়তা করবে-

  • শৈশব চোখের পলকেই ফুরিয়ে যায়। আপনার শিশুর শৈশব ভরিয়ে দিন আপনার সংস্পর্শে। তার সঙ্গে খেলুন, আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে নিয়ে যান, দূরে কোথাও ঘুরে আসুন। সন্তানের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক যেন হয় বিশ্বাস আর ভালোবাসার।
  • সন্তানকে সততার শিক্ষা দিন। দায়িত্ব সম্পর্কে বোঝান। বড়দের সম্মান করতে শেখান। তাকে বোঝান সব কাজে ধৈর্য ধারণ করতে হয়। এসব শিক্ষার মাধ্যমে তার জীবনের মজবুত ভিত্তি তৈরি হবে।
  • অন্যদের সঙ্গে কীভাবে মিশতে হয় তা শেখান। শিশুরা খেলার সময় কোনো সমস্যায় পড়লে তা তাদের সমাধান করতে দিন। অন্যের মতের প্রতি কীভাবে সম্মান দেখাতে হয় তা শিক্ষা দিন।
  • সন্তানকে খাওয়া, ঘুম, খেলার সময় নির্দিষ্ট করে দিন। এতে সে সময়ানুবর্তীতা শিখবে।
  • সন্তানের মাঝে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। তাকে নতুন নতুন বই উপহার দিন। একটা বই পড়া শেষ হলে তার কাছে বইটি সম্পর্কে জানতে চান।
  • যে কোনো ভালো কাজের জন্য তার প্রশংসা করুন, তা যতই ছোট হোক। খারাপ কাজের জন্য কখনো বকা দেবেন না, বুঝিয়ে বলুন কাজটি কীভাবে করা উচিত ছিল।
  • বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর একটি নিজস্ব জগৎ গড়ে ওঠে, তাতে আমাদের বাধা দেয়া উচিত নয়, বাধা দেয়ার প্রয়োজন হলেও তার উপযোগী করে আমাদের বোঝানো উচিত, যাতে সে বুঝতে পারে বিষয়টি।
  • children-reading

  • শিশুর মনে থাকে হাজার প্রশ্ন, শিশু যখন তার জানার আগ্রহ প্রকাশ করে, তখন আমাদের উচিত শিশুদের কৌতুহল মেটানো, তাদের প্রতি বিরক্ত প্রকাশ না করা, তারা যেন কোনো অবস্থাতেই নিরুৎসাহিত বোধ না করে।
  • শিশুকে পরিমিত আদর করতে হবে, অতিরিক্ত আদর ক্ষতিকর।
  • শিশুর সব চাহিদা সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করা ঠিক নয়। তার চাহিদা পূরণ করা বা না করার পেছনে যুক্তি দিয়ে তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। এতে করে শিশু অতিরিক্ত জেদ করা শিখবে না এবং বুঝতে শিখবে চাইলেই পাওয়া যায় না।
  • নিজের রাগ বা বিরক্ত কখনই শিশুর উপর প্রকাশ করা ঠিক না।
  • পারিবারিক বিষয়ে রাগারাগি, হৈচৈ শিশুর সামনে করা উচিত নয়, বড়দের বিষয় নিয়ে ছোটদের সামনে কথা বলা উচিত নয়। এতে শিশু এককেন্দ্রিক বা মানসিক প্রতিবন্ধীও হয়ে যেতে পারে।
  • শিশুদের চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
  • শিশুদের খেলনা নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে। পিস্তল জাতীয় খেলনা না দিয়ে সৃজনশীল খেলার জিনিস দিতে হবে।
  • তাদেরকে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে না রেখে অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিলামেশার সুযোগ করে দিন। পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে দিন।
  • শিশুকে অযথা কোনো কিছুর লোভ দেখানো যাবে না।
  • তাদেরকে নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস তৈরি করা উচিত। যেমন- নিজের কাপড় গোছানো, খেলনা গোছানো, জুতা পরা, দাঁত মাজা, চুল আঁচড়ানো ইত্যাদি।
  • শিশুকে শুধুই আদর করতে হবে, শাসন করা যাবে না, এটা ঠিক নয়, তবে শাসনের ধরনটা এমন হওয়া উচিত যাতে সে বুঝতে পারে কেন শাসন করা হলো।
  • শিশুকে নির্দিষ্ট বয়সে স্কুলে পাঠান, নির্দিষ্ট বয়সের আগে বা পরে না।
  • শিশুকে দল বেধে খেলার সুযোগ দিন, এতে সে নেতৃত্ব দেয়ার বিষয়টা শিক্ষা লাভ করতে পারে।

শিশুর নেতৃত্ব দক্ষতায় ও লালন-পালনে কিছু সাধারণ পরামর্শঃ

সন্তান লালন পালনের ক্ষেত্রে চমৎকার একটি নির্দেশনা হলো সন্তানের সঙ্গে এমন আচরণ করুন, যে আচরণ আপনি অন্য লোকদের কাছ থেকে নিজের জন্য আশা করে থাকেনঃ

০১. বাবা কিংবা মা হিসেবে কী করা উচিত তার হোমওয়ার্ক করুন:
বাচ্চারা কীভাবে আচরণ করে, কীভাবে বেড়ে ওঠে সে সম্পর্কে পড়াশোনা করুন, শিখুন। খুব সাধারণ একটি উদাহরণ হলো, প্রায়শই দেখা যায় বাবা-মা সন্তানকে শাস্তি দিচ্ছেন দেয়ালে ছবি আঁকার কারণে কিংবা খাওয়ার সময় মুখ থেকে খাবার ফেলে দেওয়ার কারণে। অথচ এই ছবি আঁকার সহজ ব্যাখ্যা হচ্ছে আপনার সন্তানের মধ্যে শৈল্পিক প্রবণতা ও সৌন্দর্যবোধের অনুভূতি রয়েছে। তাই এর সঠিক সমাধান হওয়া উচিত একসাথে দেওয়ালটি পরিষ্কার করা এবং চার্ট পেপার দিয়ে পুরো দেয়াল সাজিয়ে আপনার সন্তানকে বলা যে, সে এখন ইচ্ছেমতো আঁকতে পারে।
আর খাবার ফেলে দেওয়ার ব্যাপারে খুব বেশি জোড়াজুড়ি না করে সাত কিংবা তার চাইতে একটু বেশি বয়স পর্যন্ত তাকে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিন যেন সে ব্যাপারটি আয়ত্ত্ব করতে পারে।

০২. নিজের যত্ন নিন, নিজেকে সময় দিন:
আপনি যখন প্লেনে চড়েন প্লেনের মাইকে কোন কথাটি ভেসে আসে? এটি কি বলে না যে, আপনার সাথে যদি কোন বাচ্চা থাকে, তবে প্রথমে নিজের অক্সিজেন মাস্কটি পরে নিন এবং আপনার সন্তানকে তার মাস্কটি পরতে সাহায্য করুন? বাবা-মা বিশেষ করে মায়েরা তাদের সন্তানের জন্মের পরে নিজের সকল চাহিদা, সকল প্রয়োজনীয়তাকে অবহেলা করতে শুরু করেন। অত্যন্ত মেধাবী এক চিত্রশিল্পীর সাথে দেখা হওয়ার পরে তাকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম কোন কাজটি তুমি সবচাইতে বেশি ভালোবাসো, সে দু:খের সাথে জবাব দিয়েছিলো বিয়ের পর গত ১০ বছরে সে ক্যানভাসে তুলির একটি আঁচড়ও কাটে নি। ভেবে দেখুন এই এতোগুলো বছর কি পরিমাণ হতাশা সে বুকে বয়ে বেড়াচ্ছিলো।
এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, বাবা-মা রা তাদের নিজেদের খেয়াল রাখবেন, যত্ন নিবেন; কেননা নিজের অক্সিজেন মাস্কটি না পরলে কোনভাবেই আপনার সন্তানের খেয়াল রাখার মতো সুস্থতা আপনার থাকবে না।

active

০৩. শাস্তির পরিবর্তে ভুল শোধরানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন:
দুষ্টুমির কারণে শাস্তি পেয়েছেন এই বলে যদি আপনার বন্ধু আপনাকে ক্রমাগত খোঁচাতে থাকে আপনার কেমন লাগবে বলুন তো? আপনার সন্তান যদি কোন ভুল করে সেক্ষেত্রে তাকে শাস্তি না দিয়ে সেই ভুল শোধরানের অভ্যাস গড়ে তুলুন। শাস্তিদানের ব্যাপারটার মধ্যে এক ধরণের আঘাত থাকে যা বাচ্চার মানসিক গঠনের অন্তরায় হতে পারে। তাছাড়া প্রতিটি ভুল কাজ কিংবা ভুল আচরণই শোধরানো সম্ভব ভুল হয়ে যাওয়ার পরে কি করতে হবে তা সঠিকভাবে শেখানোর মাধ্যমে। যেমন- কোনকিছু মেঝেতে ফেললে তা মুছে ফেলা ইত্যাদি।

০৪. ভালো আচরণের জন্য আপনার সন্তানের প্রশংসা করুন
আপনার সন্তানের কাজগুলোকে ইতিবাচকভাবে বর্ণনা করুন। যেমন “যাক অবশেষে দুষ্টুটা তাহলে ক্লান্ত হলো” না বলে বলুন “তুমি এতো শান্ত হয়ে চমৎকারভাবে বসেছো, আমার খুব ভালো লাগছে।”
যে কোন ধরণের নেতিবাচক বর্ণনা স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং নেতিবাচক আচরণের প্রবণতা বৃদ্ধি করবে।

০৫. আপনার সন্তানের সাথে নম্রভাবে, যথাযথ সম্মানের সাথে কথা বলুন
আপনি যেভাবে কথা বলেন আপনার সন্তান ঠিক একইভাবে কথা বলাটাকে আয়ত্ত্ব করবে। তাই আপনি যদি একজন নম্র-ভদ্র সন্তান চান, বাবা-মা হিসেবে সন্তানের সাথে নম্র-ভদ্র আচরণই আপনাকে করতে হবে। এমন কিছু আপনার সন্তানকে বলবেন না যা তাকে আঘাত করবে কিংবা তার মধ্যে এ ধরণের অনুভূতি তৈরি করবে যে তার প্রতি আপনার ভালোবাসা তার আচরণের উপর নির্ভরশীল। আপনার সন্তানকে অনুভব করতে দিন, তার প্রতি আপনার ভালোবাসা একেবারেই নিঃশর্ত।

০৬. স্বউদ্যোগী হোন এবং খারাপ আচরণ প্রতিরোধে পরিকল্পনা করুন:
ধরুন আপনি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন এবং আপনার সন্তানও আপনার সাথে যাবে। সেখানে আপনার যথেষ্ঠ সময় লাগবে এবং আপনি জানেন আপনার সন্তান খুব তাড়াতাড়ি অস্থির হয়ে পড়বে, তাই আপনার ব্যাগে এমনকিছু রাখুন, হতে পারে সেটি খেলনা সামগ্রী কিংবা অন্য কিছু, যা দিয়ে সে কিছু সময় অন্ততঃ কাটাতে পারবে। এই পুরোটা সময় তাকে শান্তভাবে চুপচাপ বসে থাকতে বলাটা বাচ্চার স্বাভাবিক আচরণের বিরোধী।

০৭. একবারে একটি ভুল ধরুন, তার বেশি নয়
যদি আপনার সন্তানের আচরণে অনেকগুলো ভুল খুঁজে পান, সেখান থেকে একটি কিংবা দুইটি ভুল আচরণ বাছাই করুন এবং তা শোধরানোর চেষ্টা করুন; বাকি ভুলগুলো আপাততঃ উপেক্ষা করুন। তোমার এটা ভুল, ওটা ভুল, সারাদিন এই ধরনের অভিযোগ মারাত্মক হতাশা তৈরি করে এবং এতে বাচ্চা নিজেকে খারাপ ভাবতে শুরু করে। সে নিজের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং হাল ছেড়ে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে সে আরো বাজে আচরণ করতে থাকে।

০৮. সত্যিকার অর্থে কার্যকরী সময় কাটান:
আসলে কি পরিমাণ সময় আপনি আপনার সন্তানের সাথে কাটাচ্ছেন তার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার সাথে কাটানো মূহুর্তগুলো আপনি কীভাবে ব্যয় করছেন। ঘরে থাকা অনেক বাবা-মায়েরা বাসার কাজকর্মে কিংবা প্রাত্যহিক রুটিন কাজে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে তারা তাদের সন্তানের সাথে একটু কথা বলতে কিংবা খেলতে ভুলে যান নতুবা ক্লান্তির কারণে পেরে উঠেন না।

সবশেষে, এই কথাটি সবসময় মনে রাখবেন আজকে আপনার তরুণ বয়সে, শারীরিকভাবে শক্তিশালী থাকার এই সময়টিতে যে বীজ আপনি বপন করবেন তারই ফসল আপনি তুলবেন কালকে আপনার বৃদ্ধ বয়সে, দুর্বল সময়টিতে।

Shaila Shahanaj

Shaila Shahanaj

Shaila Shahanaj lives with deep passion of in psychology. She have expertise in behavior and mind, embracing all aspects of conscious and unconscious experience as well as thought.
Beside she loves music and read lots of books.
Shaila Shahanaj

Comments

লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো ?

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY