গর্ভকালীন সময়ে মা ও শিশুর যত্ন

0
785
গর্ভকালীন সময়ে মা ও শিশুর যত্ন
3 (60%) 2 votes

গর্ভকালীন সময়ে মায়ের চাই বিশেষ যত্ন। মহিলাদের গর্ভধারনের পূর্বেই নিজের স্বাস্থ্য, গর্ভধারণ ও সন্তান পালন সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার। কারণ একজন সুস্থ্য মা-ই পারে একটি সু্স্থ ও স্বাভাবিক শিশুর জন্ম দিতে। তাই গর্ভবতী মায়ের জন্য প্রয়োজন সঠিক যত্ন ও পরিচর্যা। গর্ভকালীন যত্ন বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে বিশেষ ভাবে সাহায্য করতে পারে।

প্রথমেই আলোচনা করছি মায়ের যত্ন কিভাবে করা যাবে

গর্ভকালীন যত্নের প্রধান উদ্দেশ্য হলো গর্ভবতী মাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থতার মাঝে তৈরী করে তোলা যেন তার প্রসব স্বাভাবিক হয়, তিনি যেন একটি স্বাভাবিক সুস্থ শিশু জন্ম দেন, সন্তানকে বুকের দুধ দিতে পারেন এবং সন্তোষজনকভাবে তার এবং শিশুর যত্ন নিতে পারেন।

pregnet-women-care-2

গর্ভবতী অবস্থায় যা করা যাবে না

  • গৃহস্থালীর কঠিন কাজ যেমন-ধান মাড়াই, ধান ভানা, ঢেঁকিতে চাপা ইত্যাদি
  • ভারী কোন কিছু তোলা
  • দূরে যাতায়াত করা এবং ভারী কিছু বহন করা
  • শরীরে ঝাঁকি লাগে এমন কাজ করা
  • দীর্ঘ সময় কোন কাজে লিপ্ত থাকা
  • ঝগড়া ঝাটি এবং ধমক দেয়া
  • জর্দা, সাদা পাতা খাওয়া
  • তামাক, গুল ব্যবহার করা
  • ধূমপান বা অন্য কোন নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করা
  • স্বাস্থ্য কর্মী বা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোন ঔষধ গ্রহণ করা

pregnent-mom-food

গর্ভবতী মা কি খাবেন, কি পরিমাণ খাবেন

  • প্রতিদিন তিন ধরণের খাবারের তালিকা থেকেই কিছু কিছু খাবার খেতে হবে।
  • প্রতিবেলায় স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশী খেতে হবে।
  • গভর্বতী মাকে বেশী করে পানি খেতে হবে
  • আয়োডিনযুক্ত লবণ তরকারীর সাথে খেতে হবে। তবে অতিরক্ত লবণ খাওয়া যাবে না।

pregnent-mom-treatment

গর্ভবতী মায়ের চিকিৎসা

  • মায়ের কোন অসুখ থাকলে তা নির্ণয় করা এবং তার চিকিৎসা করা যেমন-গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ, প্রি-একলাম্পশিয়া বা একলাম্পশিয়া এবং বাঁধাপ্রাপ্ত প্রসবের পূর্ব ইতিহাস।
  • মা যেন গর্ভকালীন সময়ে নিজের যত্ন নিতে পারেন, আসন্ন প্রসবের জন্য নিজে তৈরী হতে পারেন এবং নবজাত শিশুর যত্ন নিতে পারেন তার শিক্ষা দেয়া।
  • গর্ভাবস্থায় জটিল উপসর্গগুলি নির্ণয় করা। এর ব্যবস্থাপনা করা যেমন- রক্ত স্বল্পতা, প্রি-একলাম্পশিয়া ইত্যাদি।
  • ঝুকিপূর্ণ গর্ভ সনাক্ত করা।
  • উপদেশের মাধ্যমে মাকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করা, রক্তস্বল্পতা, ম্যালেরিয়া এবং ধনুষ্টংকারের প্রতিরোধক ব্যবস্থা নেয়া।
  • নিরাপদ প্রসব বাড়ীতে না স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোথায় সম্ভব হবে তা নির্বাচন করা।
  • প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কর্মীর ব্যবস্থা করা।
  • সকল গর্ভবতী মায়ের রেজিষ্ট্রেশন করা।
  • অপুষ্টিতে আক্রান্ত মায়েরা যে সন্তানের জন্ম দেয়, তাদের জন্ম ওজন কম হয়, বুদ্ধির বিকাশ ব্যাহত হয় ও স্বাস্থ্য ভাল থাকে না। আমাদের দেশে বেশির ভাগ মেয়েরা কম বয়সে গর্ভধারণ করে এবং প্রায় সবাই অপুষ্টির শিকার হয়। এর ফলে অপুষ্ট সন্তান জন্ম গ্রহন করে বা কখনও কখনও মহিলারা মৃত সন্তানও প্রসব করে।

গর্ভকালীন অবস্থাই স্বাস্থ্য পরীক্ষা

গর্ভাবস্থায় অন্তত চারবার গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে (মায়ের ওজন, রক্তস্বল্পতা, রক্তচাপ, গর্ভে শিশুর অবস্থান পরীক্ষা করা:

  • ১ম স্বাস্থ্য পরীক্ষা = ১৬ সপ্তাহে (৪মাস)
  • ২য় স্বাস্থ্য পরীক্ষা = ২৪-২৮ সপ্তাহে (৬-৭ মাস)
  • ৩য় স্বাস্থ্য পরীক্ষা = ৩২ সপ্তাহে (৮মাস)
  • ৪র্থ স্বাস্থ্য পরীক্ষা = ৩৬ সপ্তাহে (৯মাস)

রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা

টিটেনাস টিকার ৫টি ডোজ সম্পন্ন করা (প্রথম টিকা নেবার ২৮ দিন পরে দ্বিতীয় টিকা, ৬ মাস পরে তৃতীয় টিকা, ১ বছর পরে ৪র্থ টিকা এবং তার ১ বছর পরে ৫ম টিকা)। টিটি টিকার কর্মসূচীর আওতায় অন্তর্ভুক্ত হলে ৫ টি টিকা সম্পন্ন করা উচিত। যদি ৫ টি টিকা নিয়ে থাকেন তাহলে আর নিতে হবেনা। যদি সে ১ম ডোজ নেয়া থাকে তাকে ২য় ডোজ দিতে হবে, যদি ২য় ডোজ নেয়া থাকে তাকে ৩য় ডোজ দিতে হবে (২য় ডোজ নেয়ার অন্তত ৬ মাস পর), যদি সে ৩য় ডোজ নেয়া থাকে তাকে ৪র্থ ডোজ দিতে হবে (৩য় ডোজ নেয়ার কমপক্ষে ১ বছর পর), যদি সে ৪র্থ ডোজ নেয়া থাকে তাকে ৫ম ডোজ দিতে হবে (৪র্থ ডোজ নেয়ার কমপক্ষে ১ বছর পর)

যদি আপনি কোন টিটি টিকা না দিয়ে থাকেন তাহলে টিকা শুরু করতে হবে এবং গর্ভাবস্থায় ৫ মাস পর ২ টি টিটি টিকা নিতে হবে, সিডিউল অনুযায়ী বাকি টিকাগুলো নিতে হবে।

দীর্ঘস্থায়ী ইমিউনিটির জন্য ৫ টি টিটি টিকার নির্ধারিত সময়সূচী

  • ১ম ডোজ (TT1): ১৫ বছর বয়সে অথবা প্রসব পূর্ববর্তী প্রথম ভিজিটে
  • ২য় ডোজ (TT2): ১ম ডোজ নেয়ার অন্তত: ১ মাস (৪ সপ্তাহ) পর
  • ৩য় ডোজ (TT3): ২য় ডোজ নেয়ার অন্তত: ৬ মাস পর
  • ৪র্থ ডোজ (TT4): ৩য় ডোজ নেয়ার কমপক্ষে ১ বছর পর
  • ৫ম ডোজ (TT5): ৪র্থ ডোজ নেয়ার কমপক্ষে ১ বছর পর
  • ম্যালেরিয়া এবং ফাইলেরিয়া রোগ প্রতিরোধের জন্য মশারী (সম্ভব হলে ওষুধ যুক্ত) ব্যবহার করা

গর্ভকালীন সময়ে ওজন নেয়ার গুরুত্ব

  • গর্ভবতী মহিলার পুষ্টির অবস্থা নির্ণয় ও এ ব্যাপারে সঠিক দিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য।
  • গর্ভবতী মহিলার ওজন বৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য
  • একাট সুস্থ ও স্বাভাবিক ওজনের শিশুর জন্ম নিশ্চিত করার জন্য
  • গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন জটিলতা কমানোর জন্য
  • মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমানোর জন্য

গর্ভাবস্থায় ওজন বৃদ্ধি না হওয়ার কারণসমূহ জানতে হবে

  • শিশু ও কিশোরী বয়সে দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিতে এবং রক্তস্বল্পতায় ভোগা
  • কিশোরী বা অল্প বয়সে গর্ভধারণ করা
  • ঘন ঘন সন্তান ধারণ করা
  • গর্ভাবস্থায় কম খাদ্য গ্রহণ ও সুষম খাদ্য গ্রহণ না করা
  • গর্ভকালীন সময়ে রক্ত স্বল্পতায় ভোগা

new-born-baby-care

শিশুর যত্ন সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল

  • মায়ের দুধে এন্টিবডি থাকে যা শাল দুধে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। এই এন্টিবডি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। শিশুর অসুখ কম হয় যেমন- ডায়রিয়া, কান পাকা, সর্দি-কাশি, চুলকানি, নিউমোনিয়া, সেপসিস ইত্যাদি হবার সম্ভাবনা কমে যায়, এছাড়াও এতে প্রচুর ভিটামিন-এ থাকে। শাল দুধ শিশুর প্রথম কালো পায়খানা বের হতে সাহায্য করে। শিশুর শরীরে যতটুকু পানির দরকার তা মায়ের দুধে বিদ্যমান। শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ালে মা ও শিশুর বন্ধন দৃঢ় হয়।
  • মায়ের দুধ শিশুর চোয়াল এবং দাঁত ও মাড়ি গঠনে সহায়তা করে।
  • মায়ের দুধ দেয়ার সময় মায়ের শরীরের সাথে লেগে থাকার কারণে শিশু মায়ের উষ্ণতা পায়, যা শিশুর জন্য খুব প্রয়ো।
  • শিশুর অসুস্থতার সময় দিনে-রাতে ঘন ঘন মায়ের দুধ দিলে শিশু তাড়াতাড়ি অসুখ থেকে সেরে উঠবে এবং অপুষ্টি থেকে রক্ষা পাবে।

গর্ভের শিশুর শারীরিক ও মানসিক পরিপূর্ণ বিকাশের পূর্বশর্ত হচ্ছে মায়ের সুস্থতা সুনিশ্চিতকরণ। এ জন্য একজন নারীকে নিজেই যেমন হতে হয় স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন, তেমিন গর্ভবতী মায়েদের প্রতি যত্নশীল হতে হয় পরিবারের সবার। গর্ভবতী মায়ের পরিচর্যা ‘গর্ভস্থ সন্তান ও মা’ উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

Afrin Mukti

Afrin Mukti

Afrin complete her MBA in marketing, beside this she love music and read lots of books. She also write about online marketing, Bangladesh fashion trend and anything that interested her. She is very dynamic and details oriented.
Afrin Mukti

Comments

লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো ?

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY