গর্ভবতী মায়ের জন্য ব্যায়াম

0
437
গর্ভবতী মায়ের জন্য ব্যায়াম
5 (100%) 1 vote

সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা একজন নারীকে মা’তে রুপান্তর করে। একজন নারীই বলতে পারবে মাতৃত্বের সুখ কী। তাই গর্ভে আসা সন্তানটিকে যত্ন শুরু করেন গর্ভের প্রথম মাস থেকেই। আর এই জন্যই শিশুর সুন্দর মুখশ্রীর জন্য মায়েরা ঘর জুড়ে লাগিয়ে রাখেন মন মুগ্ধ করা শিশুদের ছবি। কিন্তু মায়েদের মনে রাখতে হবে সুন্দর মুখশ্রীর সাথে প্রয়োজন আসন্য শিশুর সুস্থ্য মস্তিষ্ক বিকাশ। একজন সচেতন নারীই পারেন একটি সুস্থ-সবল শিশুর জন্ম দিতে। গর্ভবতী নারীর একটু বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন হয় – এটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু এ সময়ে ব্যায়াম করাটা কতখানি জরুরি, আদৌ জরুরি কি না এ ব্যাপারে জানা নেই বেশির ভাগ মানুষেরই।

স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের জন্য যেমন সুষম খাবারের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নিয়মিত ব্যায়াম করাও। গর্ভকালীন সময়ও তার ব্যতিক্রম নয়। গর্ভকালীন সময় সাধারণত বেশির ভাগ নারীরই ওজন ১৫ কেজি বেড়ে যায়। যেহেতু আগের তুলনায় কায়িক শ্রম করা অনেক কমে যায়, তাই ওজন বেড়ে যাওয়া একেবারেই স্বাভাবিক। এই বাড়তি ওজনের সাথে সাথে নিজেকে আনফিট মনে হতে থাকে। ধীরতা, স্থবিরতা আসে। কিন্তু এ সময়ে যদি সঠিক ব্যায়াম করা যায় তাহলে মা ও শিশু দুজনেই ভালো থাকেন। তবে অবশ্যই নিজে থেকে কোনো ব্যায়াম করতে যাবেন না। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় যদি কোনো জটিলতা থাকে, তাহলে সবার আগে নিজের ডাক্তারের কাছে নিন যে, আদৌ আপনার ব্যায়াম করা উচিত হবে কি না!

গর্ভবতী মায়ের যেসব কারণে করা উচিত ব্যায়াম

  • গর্ভকালীন সময়ে নানারকম শারীরিক সমস্যা হতে পারে। যেমন – পিঠে ব্যথা, রাতে ঘুম না হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি। আর এখানেই ব্যায়ামের উপকারিতা। নিয়মিত ব্যায়াম করলে পিঠের ব্যথা কমে যায়, ইন্টেস্টাইনের মুভমেন্ট বৃদ্ধি পেয়ে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হয়। ব্যায়াম স্ট্রেস ও উদ্বিগ্নতা কমিয়ে রাতে ঘুমাতে সাহায্য করে। ব্যায়াম রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে চেহারায় নিয়ে আসে নতুন উজ্জ্বলতা।
  • গর্ভকালীন সময়ে হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে হাত-পায়ের জোড় ঢিলে হয়ে যায়। ফলে হাত-পায়ে ব্যথা হতে পারে। জোড়ের মধ্যে যে লুব্রিকেটিং ফ্লুয়িড থাকে, ব্যায়াম করলে তার পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে হাত-পায়ে ব্যথা অনেক কম হয়।
  • ব্যায়াম ঊরু, পিঠ ও শরীরের নিম্নাংশের মাসল টোন করে পশ্চার ভালো করতে সাহায্য করে। আপনার শরীরকে প্রসবের জন্য প্রস্তুত করে। হার্ট ও পেশীকে শক্তিশালী করে প্রসবের সময় লেবার পেইন কমায়।
  • গর্ভাবস্থায় যেহেতু চেহারায় অনেক পরিবর্তন আসে তাই অনেকে এই বদলগুলোর সাথে চট করে মানিয়ে নিতে পারেন না। নিজেকেই অচেনা মনে হয়। মন-মেজাজ ভালো থাকে না। ব্যায়াম করলে মস্তিষ্কে এন্ডরফিন (এক ধরনের কেমিক্যাল) নিঃসৃত হয় যা মন ভালো রাখতে সহায়তা করে। এছাড়াও ব্যায়াম এনার্জি লেভেল বাড়াবে ও আপনাকে “সেন্স অব কন্ট্রোল” দেবে, যা পরোক্ষভাবে মন ভালো রাখে।

excercise-for-pregnet-women

তাই মায়েরা মনোযোগ দিয়ে শুনুন! গর্ভকালীন সময়ে সপ্তাহে তিনবার ২০ মিনিটের হালকা ব্যায়াম আপনার নবজাতক সন্তানের মস্তিষ্ক বিকাশে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য। মন্ট্রিল বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অধিভুক্ত CHU Sainte-Justine children’s hospital এর গবেষকরা বলেন, ‘জন্মের পর পরই এই মস্তিষ্কের বিকাশ শিশুটির পুরো জীবন জুড়েই প্রভাব বিস্তার করে।’

গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক ডেভ এলেম্বার্গ বলেন,”আমাদের গবেষণাতে এটা বোঝা গিয়েছে যে, গর্ভাবস্থায় হালকা ব্যায়াম নবজাতক সন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে”। প্রাণীদের উপর এর আগে পরিচালিত এক গবেষণায় একই ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এধরণের গবেষণা এটি প্রথম। গবেষকদের মতে, নতুন এই ফলাফল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও মানব মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া এটি হয়তো নারীদেরকে আরো স্বাস্থ্য সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করবে। গর্ভাবস্থায় একদমই হালকা ধরনের ব্যায়াম তাদের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যত জীবনে অনেক ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এলেম্বার্গ ও তার সহকর্মী অধ্যাপক ডেনিয়েল কার্নিয়ার এবং পি এইচ ডিশিক্ষার্থী এলিস লাবন্তে-লেময়েন তাদের এই গবেষণা ফলাফল স্যান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত নিউরোসায়েন্স ২০১৩ কংরেসে উপস্থাপন করেন। গবেষণায় অংশ নেয়া একটিদলের সন্তান সম্ভবা মায়েরা নির্দেশনা অনুযায়ী ২০ মিনিট ধরে হালকা ধরণের কার্ডিও ভাস্কুলার ব্যায়াম করেন।

pregnet-women-meditation

আরেক দলের মায়েরা কোন ব্যায়াম করেন নি। সন্তান জন্ম হওয়ার ৮-১২ দিনের মাথায় ইলেক্ট্রো-এনসেফালোগ্রাফির মাধ্যমে নবজাতকদের মস্তিষ্কের বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা গেল, যেসব মায়েরা গর্ভকালীন সময়ে হালকা ব্যায়াম করেছিলেন, তাদের সদ্য-ভূমিষ্ঠ সন্তানের মস্তিষ্ক অনেক বেশি সক্রিয়। অর্থাৎ তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ একই বয়সের অন্য শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি।

গর্ভবতী মায়েরা সামান্য কিছু ব্যায়ামের দ্বারাই নিজের শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখতে পারেন। সন্তান প্রসবের ব্যাপারে সাধারণত সব মেয়েরই একটা ভয় কাজ করে। তাই গর্ভাবস্থায় ব্যায়ামের মাধ্যমে পেটের মাংসপেশীকে মজবুত রেখে শিশুর বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে পারবেন। এছাড়া পেলভিস মাংসপেশীর স্থিতিস্থাপকতা ঠিক রেখে নিরাপদে প্রসব করতে পারবেন।

সবসময় একটা কথা মনে রাখবেন, গর্ভাবস্থায় সঠিকভাবে দম নেয়া উচিত। তাতে শরীরের দূষিত পদার্থ বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে এবং ব্যায়ামের ফলে শরীরে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায় বলে শরীর সুস্থ ও সবল রাখে। আবার বেশি ব্যায়াম গর্ভবতী মায়েদের জন্যে খুবই ক্ষতিকর। গর্ভবতী মহিলাদের প্রতিদিন সকালে ব্যায়াম করা ভালো।

গর্ভবতী মহিলারা ব্যায়াম শেষে অবশ্যই ১০ মিনিট শবাসনে বিশ্রাম নিন এবং মনে মনে এ অবস্থা কল্পনা করুন- পরম করুণাময় আপনাকে একটি সুস্থ সুন্দর মেধাবী শিশু প্রসব করার ক্ষমতা দিয়েছেন। আপনি বেশ ভালো বোধ করছেন। ব্যায়াম শেষে বিশ্রাম নেয়ার পরে হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল অথবা তোয়ালে ভিজিয়ে সমস্ত শরীর মুছে ফেলুন। স্বাভাবিক মহিলাদের মতো গর্ভবতী মহিলারাও ব্যায়ামের সময় খোলামেলা আলো-বাতাসপূর্ণ ঘরে ব্যায়াম করুন। শীতের সময় ঘরে ব্যায়াম করার পূর্বে বাতাস চলাচল করিয়ে নিয়ে ব্যায়াম করুন।

শেষ কথা হলো, গর্ভধারিণীর অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যায়াম করা উচিত। সবসময় ডাক্তারের পরামর্শে চলা উচিত। ১৫ দিন অন্তর ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ডাক্তারের পরামর্শে ৯ মাস পর্যন্ত ব্যায়াম করতে পারেন। তবে অবশ্যই মনে রাখবেন চিকিৎসক যদি আপনাকে ব্যায়াম করতে নিষেধ করেন কিংবা নির্দিষ্ট ব্যায়ামগুলোর মধ্যে যে কোনোটি বিশেষভাবে বারণ করেন তাহলে করবেন না। কেননা একজন চিকিৎসকই এসময় আপনার সম্পর্কে এবং অভ্যন্তরীণ শিশুর পজিশন সম্পর্কে ভালো বুঝবেন। নিজে নিজে ব্যায়াম করতে গিয়ে হিতে বিপরীত করবেন না।

বি.দ্র.: গর্ভাবস্থায় কোনো মতেই তাড়াহুড়ো করে ব্যায়াম করা উচিত নয়। প্রতিটি ব্যায়াম করার পর ২০/৩০ সেকেন্ড বিশ্রাম নিয়ে তবে অন্য একটি ব্যায়াম করতে হবে। ব্যায়ামের সময় আরামদায়ক পোশাক পরা উচিত।

Afrin Mukti

Afrin Mukti

Afrin complete her MBA in marketing, beside this she love music and read lots of books. She also write about online marketing, Bangladesh fashion trend and anything that interested her. She is very dynamic and details oriented.
Afrin Mukti

Comments

লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো ?

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY