প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত দ্বীপরাজ্য মালদ্বীপ

0
1099
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত দ্বীপরাজ্য মালদ্বীপ
5 (100%) 1 vote

যে সকল পর্যটক সমুদ্র পছন্দ করেন, নারিকেল গাছের বাগান পছন্দ করেন এবং নির্জনতা হারিয়ে যেতে চান তাদের জন্য মালদ্বীপ আর্দশ পর্যটন স্থান। মালদ্বীপে সৈকত গুলো সত্যিই অপরূপ এবং রির্সোটগুলো তুলনাহীন। তবে রির্সোট খুবই ব্যয়বহুল। বিদেশের পর্যটকদের ভীড় মালদ্বীপে সর্বদা দেখা যায়।

পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত দেশ ভারত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র মালদ্বীপ। প্রকৃতি যেন এখানে দু’হাত ভরে সাজিয়েছে যা দুনিয়াজোড়া মানুষকে করে মুগ্ধ। আর এ কারণেই এ দেশের প্রধান আয়ের উৎস পর্যটন। প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্তর থেকে লাখ লাখ পর্যটক মালদ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন। এক ঋতুর দেশটির উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম মিলে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার ছোট ছোট দ্বীপ। এ দ্বীপগুলোর সমন্বয়েই সৃষ্টি মালদ্বীপ।

সংস্কৃত শব্দ ‘দ্বীপমালা’ শব্দ থেকেই মালদ্বীপ। আবার কেউ কেউ বলে, ‘মালে দিভেই রাজে’_ এই কথা থেকে মালদ্বীপ শব্দটির উদ্ভব। ‘মালে দিভেই রাজে’_ এই কথার অর্থ, ‘দ্বীপরাজ্য’। অনেকে মালদ্বীপকে মহলদ্বীপও বলে। মহল মানে (আরবিতে) প্রাসাদ। দ্বাদশ শতক থেকেই মালদ্বীপের মুসলিম শাসন। ইবনে বতুতা মালদ্বীপ গিয়েছিলেন ১৩৪৩ খ্রিস্টাব্দে। ইবনে বতুতা ও অন্য আরব পর্যটকরা এই অঞ্চলকে ‘মহাল দিবিয়াত’ নামে উল্লেখ করেছেন। আরবিতে মহাল অর্থ প্রাসাদ। বর্তমানে এই নামটিই মালদ্বীপের রাষ্ট্রীয় প্রতীকে লেখা হয়। সংস্কৃতে মালদ্বীপকে লক্ষদ্বীপও বলা হয়েছে। এর অর্থ লক্ষ দ্বীপের সমাহার। আসলে মালদ্বীপ লক্ষ দ্বীপের সমাহার নয়; রয়েছে ২৬টি অ্যাটোল। (অ্যাটোল মানে লেগুন ঘেরা প্রবাল দ্বীপ) ২৬টি অ্যাটোল আর ১১৯২টি ক্ষুদ্র দ্বীপ। যার মধ্যে কেবল ২০০টি বাসযোগ্য। প্রাচীন শ্রীলংকার ঐতিহাসিক গ্রন্থে মালদ্বীপকে বলা হয়েছে মহিলা দ্বীপ।

দেশটির জনসংখ্যার এক দশমাংশ বাংলাদেশী। আশ্চর্য হয়ে যাওয়ার মত একটি দেশ। মূদ্রার মান দক্ষিন এশিয়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী। দ্রুত উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে মালদ্বীপ। দ্বীপগুলো সুরক্ষিত করা হয়েছে পাথরের ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। চারদিকে শুধু উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে এবং বাংলাদেশীদের একটা বড় ভূমিকা সেখানে রয়েছে। স্বচ্ছ নীল সবুজ পানির মালদ্বীপ যেনো এক টুকরো বাংলাদেশ।

maldives-2

মালদ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যা তিন লাখের কিছু বেশি। পর্যটকদের স্বাগত জানাতে রয়েছে অত্যাধুনিক মালে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। মালদ্বীপের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে পর্যটকরা অনায়াসে ছুটে বেড়াতে পারেন এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে। পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র মালদ্বীপেই বিশালকায় সাবমেরিনে করে সমুদ্রর তলদেশে ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। যা পর্যটকদের ১২০ ফুট গভীর সমুদ্রর তলদেশ পর্যন্ত নিয়ে যায়। গভীর সমুদ্রর তলদেশে বিশাল বিশাল মাছ, গাছ-গাছালি, ভয়ংকর প্রাণী, উঁচু-নিচু পাহাড় দেখে মুগ্ধ হন পর্যটকরা। সমুদ্রর তলদেশে ভ্রমণ এতই রোমাঞ্চকর যে, বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে মালদ্বীপে। সমুদ্র উপকূলের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য রয়েছে সাফারিবোট। যা উপকূল থেকে পর্যটকদের নিয়ে যায় গভীর সমুদ্রে। সৌন্দর্য পিপাসুদের দেয় অনাবিল আনন্দ। এক একটি সাফারিবোট ১৫-২০ দিনের জন্য ২০-২৫ জন পর্যটক নিয়ে পাড়ি জমায় গভীর সমুদ্র ভ্রমণের পথে। সাফারিবোটে ভ্রমণের অংশ হিসেবে পর্যটকরা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত গাইড, অক্সিজেন, ওয়াটার প্রুফ জ্যাকেট নিয়ে পাড়ি জমায় অজানার উদ্দেশ্যে। পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য মালদ্বীপে রয়েছে প্রায় ২০০র বেশি সাফারিবোট। মালদ্বীপের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ইউরোপের দেশগুলো থেকে আসছে হাজার হাজার পর্যটক। এ কারণে শত শত হোটেল রিসোর্ট সব সময় থাকে মুখরিত।

সার্কভুক্ত দেশ মালদ্বীপের সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য বিশ্বব্যাপী আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয়। এখানকার সমুদ্রের রঙ অতি পরিস্কার ও নীল এবং বালির রঙ সাদা। সমুদ্রের মধ্যে হাজার ধরনের মাছ দেখা যায়। মালদ্বীপে বেড়াতে এলে আপনি থাকতে পারেন সমুদ্রের পানির ওপর বিশেষভাবে নির্মিত বাড়িতে। এসব বাড়ি থেকে পর্যটকরা সমুদ্রের বিভিন্ন রঙের মাছ ও প্রাণি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান; শুনতে পান সামুদ্রিক পাখির ডাক। আর যদি আপনি সমুদ্র সৈকতে থাকতে চান, তাহলে আপনার জন্য আছে বিশেষভাবে নির্মিত বাড়ি। সাধারণত সমুদ্রের মধ্যে নির্মিত বাড়িগুলো সৈকত থেক ১০ মিটার দূরে অবস্থিত। কাঠের সেতু দিয়ে সেগুলোকে সৈকতের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। কিছু কিছু জায়গায় কাঠের সেতুও থাকে না; পর্যটকরা ছোট নৌকায় করে সমুদ্রের বুকে নির্মিত বাড়িতে প্রবেশ করেন।

maldives-5

মালদ্বীপের রাংগারি দ্বীপের একটি হোটেলের কর্তৃপক্ষ সমুদ্রের ৬ মিটার গভীরে স্বচ্ছ গ্লাস দিয়ে একটি রেস্তোরাঁ নির্মাণ করেছে। এ রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে মোট ১২ জন অতিথি বসতে পারেন। এ রেস্তোরাঁয় শুধু লাঞ্চ ও ডিনার পরিবেশন করা হয়। রেস্তোরাঁর নাম ‘ithaa undersea restaurant’। স্থানীয় ভাষায় ‘ইথা’ অর্থ মুক্তা। রেস্তোরাঁর দেয়াল গ্লাস দিয়ে তৈরি। এটি সমুদ্রের গভীরে গ্লাস দিয়ে নির্মিত একমাত্র রেস্তোরাঁ। এটি নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। রেস্তোরাঁয় মোট ৬ টেবিল আছে। প্রতিটি টেবিলে মাত্র ২ জন অতিথি বসতে পারেন। অতিথিরা সুস্বাদু খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের নীচের মনোরম দৃশ্য দেখতে পারেন। নানা ধরনের রঙিন মাছ তাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। সে এক মজার অভিজ্ঞতা। তবে, এত সুন্দর পরিবেশে খাবার খাওয়ার মূল্যও কিন্তু বেশি। এখানে সবচে সস্তা লাঞ্চের জন্য আপনাকে গুনতে হবে ২০০ মার্কিন ডলার।

এখানে দেখা মিলে বিরল প্রজাতির পানি কাটা পাখি। পর্যটকরা যখন রাজধানী মালে আসেন তখন প্রথমে তাদের মন কেড়ে নেয় একটি পার্ক। সেই পার্কে রয়েছে শত শত কবুতর। এই কবুতরের সঙ্গে পর্যটকরা মনে খুলে আনন্দ-উল্লাস করে।

মালদ্বীপে আসা বাংলাদেশী পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ মালদ্বীপের রাজধানী মালের বড় মসজিদটি। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পর্যটকদের ভিড় থাকে এই মসজিদটি দেখার জন্য। দেশটিতে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার প্রবাসী শ্রমিক কাজ করছে। তার মধ্যে বাংলাদেশীদের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার।

maldives-4

মালদ্বীপে বহু বছরের পুরনো অনেক ছোট ছোট মসজিদ আছে, যা পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। মালদ্বীপের জাদুঘর পৃথিবীর সমৃদ্ধ জাদুঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে রয়েছে তাদের পুরনো স্থানীয় মুদ্রা, বিশাল বিশাল মাছের কংকাল, মালদ্বীপের লোকজ শিল্পের সংগ্রহ।

কেরালার রাজধানী ত্রিবান্দ্রম থেকে মাত্র এক ঘন্টার বিমান জার্নিতে মালে যাওয়া যায়। বিমানের জানালা থেকে উঁকি দিলে মনে হবে সমুদ্রের গর্ভে বিমান অবতরণ করবে। কিন্তু বাস্তবে তা না। বিমান বন্দরেই অবতরণ করবেন। বিমান বন্দরের চারিদিকে সমুদ্র তাই এমনটি মনে হয়। বিমান বন্দরের বাইরে এলেই পাবেন সমুদ্র বন্দর। সারি-সারি লঞ্চ প্রতিক্ষায় রয়েছে যাত্রী পারাপারের জন্য। এখানে হোটেলের দালালদের উৎপাত বেশ। তারাই দায়িত্ব নিয়ে সমুদ্র পার করে হোটেলে পৌছে দিবে। মালে শহরের যে প্রান্তেই আপনার ঠিকানা হউক না কেন সমুদ্র আপনার দৃষ্টি আড়ালে হবেনা। এটা পর্যটকদের জন্য বাড়তি পাওনা।

পরিবারের সঙ্গে কিংবা মনের মত সঙ্গীকে নিয়ে মালদ্বীপ ভ্রমনে যেমনটি আনন্দ রয়েছে। তেমনিভাবে সঙ্গী বিহীন একাকী ভ্রমনও কম আনন্দ নয়। প্রথমদিনটি মালদ্বীপ ভ্রমন করুন। খুব ভোরে চলে আসুন সমুদ্রপাড়ে। আপনার সামনে, ডানে, বায়ে সমুদ্র ঘননীল জল, ঘন সবুজ গ্রাম, ছোট ছোট বাড়ি। পথে মানুষের ভিড় নেই, ব্যস্ততা নেই। মানুষ জন শান্ত প্রকৃতির, এগিয়ে চলুন সমুদ্রের পাড় ধরে। কখনও নারিকেল বাগান, কখনও ঝাউবনের ছায়া পথ দিয়ে হেঁটে চলেছেন। তটরেখার পাথর বিছানো গোলাকার লেগুন, শান্ত নীল জলের গভীরতা কম। এখানে এশিয়া এবং ইউরোপের পর্যটশরা গোসল করছেন। আরও কতকিছু করছেন যা শুধু দেখা যায়, উপভোগ করা যায়। মালদ্বীপের সৌন্দর্য্য হচ্ছে সমুদ্রের ছোট-ছোট দ্বীপ নারিকেল গাছের সারি ও রির্সোট।

maldives-1

মালদ্বীপে এসে ভিলিগিন দ্বীপে ভ্রমন না করলে ভ্রমনের পূর্নতা আসবেনা। তাই পর্যটক বন্ধুদের উদ্দেশে বলছি অন্তত আর যাই মিস করেন না কেন ভিলিগিন দ্বীপ মিস করবেন না। সমুদ্রের মধ্যে ছড়িয়ে আছে কত ছোট ছোট দ্বীপ। চলে যান কোনও দ্বীপে, যাওয়া আসায় নৌকোভাড়া বেশি না, সময়ও বেশি লাগে না। সকালে বিকেলে দুটো করে দ্বীপ বেড়িয়ে আসুন। প্রকৃতির নিসর্গ আনন্দপ্রবাহের সঙ্গে দেহ-মন ভাসিয়ে দিয়ে কাটিয়ে দিন তিনটি দিন কাছের দ্বীপ বেলিগিন খুব ছোট কিন্তু সবুজে অসাধারণ সাগরের জলে পাডুবিয়ে বসে বসে রঙ্গীন মাছের খেলা দেখতে দেখতে সময় কেটে যাবে। অবসর বিনোদনের এমন প্রকৃতির দৃশ্য হাতছাড়া করা কি সঠিক হবে?

মালদ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের তুলনা মালদ্বীপ নিজেই। তাই এই প্রাকৃতিক রূপ আর সৌন্দর্যের জন্য দুনিয়ার পর্যটকরা এই ভ্রমণ তীর্থে ছুটে আসে।

Afrin Mukti

Afrin Mukti

Afrin complete her MBA in marketing, beside this she love music and read lots of books. She also write about online marketing, Bangladesh fashion trend and anything that interested her. She is very dynamic and details oriented.
Afrin Mukti

Comments

লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো ?

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY