ফলপ্রসূ বাজারজাতকরণ পরিকল্পনা কিভাবে করবেন?

0
869
ফলপ্রসূ বাজারজাতকরণ পরিকল্পনা কিভাবে করবেন?
5 (100%) 2 votes

বাজারজাতকরণ পরিকল্পনা হলো কোম্পানীর যাবতীয় লক্ষ্যার্জনের নিমিত্তে বাজারজাতকরণ কৌশলগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সমুদয় কার্যাবলী। একটি পণ্য, ব্যবসায় একক এমনকি একটি ব্র্যান্ডের জন্যও বাজারজাতকরণ পরিকল্পনা জরুরি। মূলত বাজারজাতকরণ পরিকল্পনা প্রতিপাদন করে ব্যবসায় এককগুলো দিয়ে কী কী করা হবে। কী ব্যবসা করবেন তা ঠিক করে হুট করে ব্যবসায় নামলেন আর তরতর করে এগিয়ে চললেন তা নয়। কোন ধরণের ব্যবসা করবেন সে পরিকল্পনা তো নেওয়াই হয়েছে। তবে যখন ব্যবসা শুরু করবেন তখনই আসল পরিকল্পনা নেওয়ার পালা। অনেক পরিকল্পনার সমন্বয়ে একটি ব্যবসার বাজারজাতকরণ পরিকল্পনা সফল হয়ে ওঠে। বলা যায় একাধিক পরিকল্পনাই একটি সম্পুর্ণ ব্যবসার বাজারজাতকরণ প্লান।

নিম্নে বাজারজাত পরিকল্পনা কিভাবে করবেন তার কয়েকটি ধাপ আলোচনা করা হলঃ

একঃ মূল বিষয়গুলো লিখে নিন
প্রথম কাজটা হলো একটা সাদাকালো ব্যাপার। মানে সাদা কাগজে কিছু লেখা। আমরা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই ভুলে যাই। একটু লেখাজোখা থাকলে আর মিসিং হওয়ার ভয় থাকেনা।

তাহলে কি লিখতে হবে?

  • এই ধরুন কি ব্যবসায় করতে চান? পণ্য না সেবা? সেটা শতকরা কতজন লোক বছরে কতদিন ব্যবহার করে। যে এরিয়া নিয়ে ব্যবসায় তার আয়তন, জনসংখ্যা, ব্যাংকিং, ডেলিভারি ও যাতায়াত সুবিধা।
  • তারপর ব্যবসা করতে প্রাথমিক কি কি জিনিস লাগবে ? তার জন্য কি পরিমাণ খরচ সময় ও লোকবল লাগবে? ইত্যাদি?
  • পণ্যটা কখন কিভাবে পাওয়া যায়? কোথায় কেমন দাম? পরিবহন পদ্ধতি কি? এর মেয়াদ? প্যাকিং পচনশীলতা ইত্যাদি।
  • ঠিক এই সময়ে পণ্যটি মানুষের জন্য কতটা ব্যবহার করা জরুরী বা এর বিকল্প আর কোনো পণ্য আছে কিনা? আর সেটা কারা প্রোভাইড করে।
  • এই পণ্যটির বা সেবাটির জন্য কাজ করতে আপনি কতটা উপযুক্ত বা এ বিষয়ে আপনার ধারণা কেমন?

কোনো একটা বিষয়ে লেখার পর আবার আপনার মত বদলে যায় তবুও লিখুন। ব্যবসা শুরু আগে মত বদলানো ব্যবসা শুরুর পরে মত বদলানোর চেয়ে ভালো নয় কি?

দুইঃ লক্ষ্যটাকে কয়েকটি ধাপে সাজিয়ে নিন
বড় কোনো লক্ষ্য একদিনে অর্জন হয়না। এটা সোজাসাপ্টা কথা। লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে উঠতে হয় পাহাড়ের চ’ড়ায় আর চলার পথে সামান্যা পা ফসকে পড়ে গেলে মিশন ফেইল। এজন্য পুরো যাত্রাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নিতে হয়। ধাপে ধাপে বেইসক্যাম্প থাকে। বিশ্রাম থাকে। প্রতি পর্বের অভিজ্ঞতা পরের পর্বে কাজে লাগানো হয়। প্রতিটি ধাপে সফলতা ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনে নতুন করে ছক সাজাতে হয়। জীবনের প্রতিটি বিষয়ই এইরকম।

মনে করি আপনি একটি ই শপ চালু করলেন আপনার লক্ষ্য বাংলাদেশের সেরা দশের মধ্যে থাকা। এখন এই কাজ কিন্তু একদিনে সম্ভব নয়। আপনার আর্থিক ও অন্যান্য সামর্থ্যের উপর ভিত্তি করে আপনি ২/৩ বছরের একটি পরিকল্পনার ছক কষবেন। আজ থেকে ২৪ মাস পরে আপনি যদি ৫ নম্বরে থাকতে চান। আপনি ধারনা করুন। ১২ মাস পরে কোথায় থাকতে হবে? ৬ মাস পরে কোন পর্যায়ে থাকবেন আর ৩ মাসে আপনার অর্জন কি হবে? ঠিক এভাবে প্রতি ত্রৈমাসিক প্লান এন্ড গোল সেট করুন। সেটাকে আবার রুটিনের মধ্যে নিয়ে আসেন প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাসে আপনার করনীয় কি কি আছে?

Marketing-Plan-3

প্রথম ৩ মাসকে এভাবে বিচার করুন

  • যা করতে চেয়েছেন তা করতে পেরেছেন কিনা? যদি না পারেন তাহলে কি সমস্যা ছিলো? এর তার সমাধান কি?
  • যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন সেগুলোর যে পরিমাণ সাড়া পাওয়ার কথা তা পেয়েছেন কিনা? না পেলে কেন পান নাই? এই অবস্থায় পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে?
  • এভাবে প্রতিটি ধাপে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করুন? ব্যর্থ হলেও আপনি ব্যর্থতার সঠিক কারণটা জানতে পারবেন। আবার যখন শুরু করবেন তখন সেটা মনে থাকবে?

তিনঃ বাজারটা বুঝে দেখুন
ব্যাপারটা বিদেশীরা খুব ভালোভাবে করে, আমরা যখন শুনি তখন কেবল প্রশংসা করি কিন্তু আমরা সেভাবে করার কথা ভাবিনা। অবাস্তব কল্পনা করে নিজের উপর বেশী আত্মবিশ্বাস রেখে শুরু করে দেই। এমনটা ঠিক নয়, আমি আপনি যা ভাবছি কনজুমার হয়তো তা ভাবছেনা।

বাজার স্টাডি করে ব্যবসায় নামুন

  • বাজার ও ব্যবসায় সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করুন।
  • নেটে সার্চ দিয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি জেনে নিন।
  • যারা এর আগে এই কাজ করেছে তাদের অভিজ্ঞতা জেনে নিন।
  • যেকোনো ধরনের অনলাইন বা অফ লাইনের একটি জরিপ করার চেষ্টা করুন? জরিপ করার সময় সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করন। এ ব্যাপারে একটা কৌতুক আছে। রাশিয়াতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রশ্ন করা হয়েছে ‘‘ আপনি কি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন’’? সবাই উত্তরে ‘‘হ্যাঁ ’’ বলেছে। জরিপের ফলাফল ‘‘ রাশিয়ায় ১০০ ভাগ ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
  • বাজারের উপর নজর রাখুন, আপনার ধারণাগুলো নোট করুন, পরে এগুলো মিলিয়ে নিজেকে নাম্বার দিন, বুঝতে চেষ্টা করুন আপনি কি বাজারকে বুঝতে পারছেন?

চারঃ কিছু সিদ্ধান্ত হবে সুনির্দিষ্ট
কিছু কিছু ব্যাপারে আপনাকে কনফিউশন রেখে যাবেনা। আপনি পরে বাস্তবতার কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তণ করতেই পারেন কিন্তু আগে আপনাকে রাস্তা ঠিক করে এগুতে হবে।

লক্ষ্য স্থির করুন

  • আপনার পণ্য কি হবে? কাদের জন্য হবে? কোন প্রক্রিয়ায় ব্যবসায় করবেন?
  • লাভ লোকসান পলিসি কি হবে? কোয়ালিটি সূত্র কি?
  • মার্কেটিং, ডেলিভারি ও এডমিন কারা হবে, কিভাবে এটা সাজানো হবে।
  • সম্ভাব্য সাড়া কেমন হতে পারে? লোকসানের সম্ভাবনা কতটুকু? সেটার জন্য আপনি কতটা প্রস্তুত।

পাঁচঃ পরিকল্পনা হবে লিখিত, ধাপে ধাপে থাকবে প্রতিবেদন ও মূল্যায়ন
প্রতিটি কাজের কথা লিখে রাখুন ডায়রী নোটবুক বা পিসিতে। একটা ছক রাখুন যেখানে কাজের ফলাফল ও কারণ লেখা যায়। এগুলো পরে কাজে দিতে পারে। সহকর্মীদের নিয়ে আলোচনা করে সমস্যা বের করে এর সমাধান বের করতে হবে।

Marketing-Plan-1

এছাড়া আরও কিছু বিষয় আছে যা সংক্ষেপে দেওয়া হলঃ

১। হুমকি ও সুযোগ বিশ্লেষণঃ
বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় টিকে থাকার ক্ষমতা যাচাই করার জন্য কোম্পানীর সামনে সম্ভাব্য হুমকি আর সুযোগগুলো খুঁজে বের করে লিপিবদ্ধ করা হয়। এবং সেই সুযোগ ও হুমকির প্রেক্ষিতে করণীয় সম্বন্ধে আলোকপাত করা হয়।
২। উদ্দেশ্য সংজ্ঞায়নঃ
বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্য সংজ্ঞায়নের চেষ্টা করা হয় এবং সেই উদ্দেশ্য কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার পরামর্শ দেয়া হয়।
৩। বাজারজাতকরণ কৌশলঃ
বাজারজাতকরণ উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব এমন বাজারজাতকরণ যুক্তি উপস্থাপিত হয় এ অংশে। এখানে উদ্দেশ্যের আলোচনার বিস্তারণ ঘটিয়ে প্রতিটি অংশের জন্য কৌশল প্রণয়ন করে তার উল্লেখ করা হয়।
৪। কর্মকৌশলঃ
এ অংশে প্রতিপাদন করা হয় বাজারজাতকরণ কৌশলগুলো কিভাবে বাস্তবে রূপায়িত করা যায়। এই অংশে কতিপয় উত্তর বের করার চেষ্টা করা হয়: কী করা হবে? কখন করা হবে? কে একাজ করতে দায়ী থাকবে? কত খরচ এজন্য হবে?
৫। বাজেটঃ
পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কত ব্যয় হতে পারে তজ্জন্য একটি সম্পূর্ণ মার্কেটিং বাজেট প্রণয়ন করতে হয়, যেন সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি্র হিসাব থাকে। যখন এই পুরো বাজেটটি উচ্চস্তরের ব্যবস্থাকগণ অনুমোদন দিয়ে দিবেন, তখন এর ভিত্তিতেই যাবতীয় ক্রয়-ব্যয় পরিচালিত হবে।
৬। নিয়ন্ত্রণঃ
পুরো পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে কিভাবে পরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং উচ্চতর ব্যবস্থাপনা কিভাবে কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবেন তার বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়।
এভাবে একটি পরিকল্পনা আপনাকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এবং ধাপে ধাপে লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করবে আর কোনা কারণে কোথায় ভুল ত্রুটি ধরা পড়লে ঠিক করা যাবে এমন কি মুল আইডিয়াটা সময় বা স্থান উপযোগী না হলে প্রথমপর্যায় থেকে সরে আসা যাবে। কিন্তু অনেক কিছু একসাথে করতে চাইলে এমন সুবিধা নাও হতে পারে। বিশেষ করে ইনভেস্টমেন্ট যদি পরিকল্পনাহীন হয় তাহলে ঝুঁকিটা একটু বেড়ে যায়।

সবচেয়ে বড় কথা যেকোন কাজ শুরু করার আগে সেকাজ সম্পর্কে না জানলে তাতে ভালো পরিকল্পনা করা যায়না। তাতে শুধু জল্পনা কল্পনা করা যায়।

Afrin Mukti

Afrin Mukti

Afrin complete her MBA in marketing, beside this she love music and read lots of books. She also write about online marketing, Bangladesh fashion trend and anything that interested her. She is very dynamic and details oriented.
Afrin Mukti

Comments

লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো ?

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY