বাবা মা কিভাবে সন্তানদের আত্মমর্যাদা/আত্মবিশ্বাস বাড়াবেন

0
532
বাবা মা কিভাবে সন্তানদের আত্মমর্যাদা/আত্মবিশ্বাস বাড়াবেন
4.2 (84%) 5 votes

শিশুদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন পরিবেশ তৈরী বর্তমান বিশ্বর জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। যেসব বাচ্চারা স্বাস্থ্যসম্মত ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন পরিবেশ পায় তারা বেড়ে উঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তারা নির্দ্বিধায় হাসতে পারে, জীবনকে উপভোগ করতে পারে। এই সব শিশুরা হয়ে উঠে বাস্তবসম্পন্ন এবং আশাবাদী।

যে সব শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস কম তারা সবসময় মনে করে তারা কোন কিছুতে ভালো নয়, কোন কিছু ঠিক মত করতে পারেনা। যেকোনো কাজে বাধা পেলে তা দূর করার চেষ্টা না করে আগেই হতাশ হয়ে যায়। তারা যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ নিতে দ্বিধা করে। তারা সকল বাবা মাদের জন্যই প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আত্মমর্যাদা কি?
আত্মমর্যাদা আত্মবিশ্বাস এর সমর্থক। এটি প্রতিদিন, প্রতিবছর পরিবর্তন হতে পারে। এটা শৈশবে বিকশিত হয় এবং প্রাপ্ত বয়স পর্যন্ত আমাদের মাঝে বিরাজ করে। ভালোলাগার সাথে নিজের সক্ষমতাকে উপভোগ করতে পারার নামও আত্মবিশ্বাস। কারণ অনেক শিশু তার সক্ষমতায় কিছু অর্জন করলেও সে তা উপভোগ করতে পারেনা, লজ্জা বোধ করে। এটাই আত্মবিশ্বাসহীনতা। তাই শৈশব থেকেই আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।

কীভাবে একজন বাবা-মা হিসাবে আপনি আপনার সন্তানদের মধ্যে একটি সুস্থ আত্মসম্মানবোধ/আত্মবিশ্বাসবোধ গঠনে সাহায্য করতে পারেনঃ

  • আপনি কি বলছেন সে ব্যাপারে সতর্ক থাকুনঃ বাচ্চারা খুব শব্দ সংবেদনশীল হয়। তারা তাদের বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যদের কথা অনুসরণ করে। এই জন্য সন্তানের ভাল কাজের জন্য শুধু তাদের প্রশংসা করলেই হবে না, বিভিন্ন কাজে জন্য তাদের যে প্রচেষ্টা তার জন্যও সন্তানের প্রশংসা করতে হবে। কিন্তু সে ব্যাপারে অবশ্যই সত্যবাদী হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনার সন্তান পরীক্ষায় খুব ভাল করতে না পারে তাহলে বলবেন না যে “ভাল করেছ, পরবর্তী সময় আরো কঠিন পরিশ্রম করতে হবে”। তার বদলে বলবেন “খুব ভাল করনি, কিন্তু চেষ্টা করেছ তাতেই আমি গর্বিত। ”

    কিছু ক্ষেত্রে সন্তানের দক্ষতার, সক্ষমতার স্তর অন্য বাচ্চাদের তুলনায় কম থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে তাদের হতাশা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে হবে। কখনও বকাঝকা করা যাবে না। তার বদলে নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে এবং উপলব্ধি করতে সাহায্য করতে হবে।

  • বাবা-মার ভূমিকা হতে হবে ইতিবাচকঃ আপনি যদি আপনার (বাবা-মা) নিজের উপর অতিরিক্ত হতাশ, কঠোর, আপনার ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবাস্তব হন তাহলে আপনার বাচ্চাদের উপরও এর প্রভাব পরবে। তাই আপনার নিজের আত্মসম্মান বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলেই আপনি হয়ে উঠবেন আপনার সন্তানদের জন্য একটি আদর্শ মডেল।
  • সন্তানদের নিজেদের সম্পর্কে ভুল ধারণা ও যুক্তিহীন বিশ্বাস সনাক্ত করা ও সঠিক নির্দেশনা দেওয়াঃ বাচ্চাদের মধ্যে নিজেদের সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা ও বিশ্বাস বদ্ধমূল হতে পারে। এইসব ভুল ধারণা ও বিশ্বাস চিহ্নিত করে তাদের নিজেদের মূল্যায়নে সাহায্য করতে বাস্তবসম্মত জ্ঞান দিতে হবে।

    উদাহরণস্বরূপ, একটি শিশু স্কুলে খুব ভাল, কিন্তু গণিতের সঙ্গে সংগ্রাম করে বলতে পারে, “আমি গণিত করতে পারি না, আমি খারাপ ছাত্র”। এটি শুধু একটি মিথ্যা ধারণাই নয়, একটি বিশ্বাসও যা সে নিজের মধ্যে ধারণা করে। সেক্ষেত্রে তাদের বিভিন্নভাবে নিজেদের মধ্যকার ইতিবাচক বিষয়গুলো সম্পর্কে উৎসাহিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সহায়ক প্রতিক্রিয়া হতে পারে, “তুমি ভাল ছাত্র, স্কুলেও ভাল। গণিত একটি বিষয় কেবল যেখানে তোমার কিছু বেশি সময় ব্যয় করতে হবে, এবং আমরা এটা একসঙ্গে করব”।

  • বাচ্চাদের স্বতঃস্ফূর্ত এবং অনুরক্ত হতে সাহায্য করাঃ আপনার (বাবা-মা) ভালবাসা আপনার সন্তানের আত্মসম্মান আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। যখন তারা কোন কাজে বারবার ব্যর্থ হয়েও আবার চেষ্টা করছে, তাকে শুধু একটু জড়িয়ে ধরে বলুন আপনি তাদের নিয়ে গর্বিত।

    সততার সাথে মাঝে মাঝে তাদের প্রশংসা করতে হবে। কিন্তু অধিক প্রশংসা আবার তাদের মধ্যে আত্মঅহংকার সৃষ্টি করতে পারে যা অন্যকে হেও প্রতিপন্ন করতে তাকে উৎসাহিত করবে। ফলে সামাজিক অসামঞ্জস্যতা, বৈষম্যতা সৃষ্টি হতে পারে।

  • সঠিক ও ইতিবাচক প্রতিত্তরঃ “তুমি সব সময় উম্মাদদের মত আচরণ কর কেন?” এটা সন্তানদের প্রতি সঠিক বক্তব্য নয়। বরং তাকে যদি বলা হত “আমি দেখেছি তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে খুব রেগে কথা বলছিলে, তুমি যদি কথাটা চিৎকার করে না বলে সুন্দর করে বলতে তো ভালো হত”। তাহলে সে সুন্দর করে কথা বলার শিক্ষা পেত এবং পরবর্তীতে তা কাজে লাগতো।
  • নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ তৈরী করাঃ বাচ্চারা বাড়িতে যদি নিরাপদবোধ না করে তবে এটা তার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সব থেকে বড় প্রতিবন্ধক হিসাবে দাঁড়ায়। যেসব বাচ্চারা প্রতিনিয়ত তাদের বাবা মা কে একে অপরেরে সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত থাকতে দেখে তারা তাদের বাড়ির ভিতরই নিজেদের অনিরাপদ মনে করে। তারা অনেক বেশী অসহায় বোধ করে। এছাড়াও বাড়ির বাইরে স্কুলে সহপাঠীদের দ্বারা, শিক্ষকদের দ্বারা বা অন্য কোন ভাবে বাচ্চাদের নির্যাতিত হতে দেখা যায়।

    তাই বাচ্চাদের সব সময় উৎসাহ দিয়ে আসতে হবে যেন তারা বড় কোন সমস্যা যা তারা নিজেরা সমাধান করতে পারবেনা সে সমস্যাটা বাবা মা অথবা বড় এবং বিশ্বস্ত কারো সাথে শেয়ার করে।

  • গঠনমূলক কাজে সহায়তাঃ প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতা বাচ্চাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক। উদাহরণস্বরূপ বাচ্চাদের পড়া শিখতে সাহায্য করা, স্বেচ্ছাসেবক এবং আপনার স্থানীয় কমিউনিটিতে অবদান রাখতে সাহায্য করা।

শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরী হতে থাকে শৈশব থেকে যা তার পরবর্তী জীবনে সফল হতে সাহায্য করে। শিশুরা বারবার কিছু করার চেষ্টা করে বিফল হয়েও আবার চেষ্টা করে এবং সফল হয়। এসময় তার নিজের সক্ষমতার উপর বিশ্বাস তৈরী হয়। একই সময়ে তারা অন্য মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে নিজের সম্পর্কে একটি স্ব-ধারণা তৈরি করে। এ কারণে পিতামাতার সম্পৃক্ততা শিশুদের সঠিক, সুস্থ, স্ব-অনুভূতি গঠনের প্রধান চাবিকাঠি।

তবে আপনি যদি মনে করেন আপনার শিশুর মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ কম এবং তা তৈরী করতে আপনি ব্যর্থ হচ্ছেন তাহলে কোনো শিশু বিশেষজ্ঞর শরণাপন্ন হন। তারা শিশুদের এই সমস্যা থেকে বেড়িয়ে আসতে সাহায্য করবে এবং নিজেদের সম্পর্কে ভালো ধারণা লাভ করবে।

রাজিয়া মিলি

রাজিয়া মিলি

Razia Mili complete her Master of Science from Eden Mohila College, Dhaka, and she is passionate about traveling and reading lots of books. She is very dynamic and details oriented that you can found in her work and she loves music during cooking special menu for her friends and family.
রাজিয়া মিলি

Comments

লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো ?

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY